Jabir Al Fatah

এই ক্ষুদ্র, গোলাকার ও নীল গ্রহটিতেই কি শুধু আমরা একা বাস করি? এই প্রজন্মের জনপ্রিয় পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংস মনে করেন, খুব সম্ভবত ‘না’। এর পেছনে চিরসত্য কারণটি হচ্ছে মহাবিশ্ব অনেক বড়। সত্যিকার অর্থেই বড়। যুগের পর যুগ ধরে মানুষের কৌতূহলী মনে জন্ম নেয়া একটি রহস্যময়ী প্রশ্নের উত্তর আমরা আজো কেউ জানতে পারিনি। সেটি হচ্ছে এলিয়েনের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন। আমাদের পৃথিবী গ্রহ হচ্ছে সূর্যের চার পাশে অবর্তনকারী আটটির মধ্যে একটি এবং প্রায় ২০০ বিলিয়ন নত্রের মধ্যে অবস্থানকারী অনেক বিশেষ একটা জায়গা। এই বিশাল সংখ্যক নত্র নিয়ে গঠিত হয়েছে আমাদের ছায়াপথ যেটাকে আমরা মিল্কিওয়ে বলে থাকি। কিন্তু এমনকি আমাদের এই মিল্কিওয়েও এরকম প্রায় ১০০ বিলিয়ন গালাক্সির মধ্যে একটি, যেন এক মহাসমুদ্রের মাঝে এক ফোটা জল। এই বিশালত্বকে গভীরভাবে উপলব্ধি করলে আমারও এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে এই মহাবিশ্বে কেবল আমরা একা। অন্য দিকে এটিও একটি যৌক্তিক প্রশ্ন যে যদি এলিয়েনের অস্তিত্ব থেকেই থাকে তাহলে তারা কি আমাদের চেয়েও বুদ্ধিমান? তবে আমাদের ধারণাতেও এক জায়গায় সীমাবদ্ধতা আছে এবং সেটা আরো মজার। কারণ, কে জানে হয়তো ভিনগ্রহের এলিয়েনরা অন্য কোনো অপরিচিত জৈবিক পদার্থ দিয়ে তৈরি জীব যেটা হয়তো মানবসভ্যতা কোনো দিন একটি জীব হিসেবেও কল্পনাও করতে পারবে না। আবার হয়তো এই প্রজাতিগুলো কোনো অতিপ্রাকৃতিক রাসায়নিক উপাদান দিয়ে সৃষ্ট যেগুলো নত্রের ঠিক কেন্দ্রস্থলে জীবনধারণ করার মতো মতা রাখে। আবার যদি এমন হয় যে, এলিয়েনরা চোখের নিমেষে জন্মে আবার চোখের নিমেষে হারিয়ে যায়! তাহলে প্রশ্ন হলো এই অসীম সম্ভাবনার অতি বৃহৎ মহাবিশ্বের কোনো জায়গায় এবং কিভাবে ভিনগ্রহের প্রাণীদের শনাক্ত করা যেতে পারে?

এর উত্তর জানার জন্য আমাদের এই পৃথিবীর দিকে ফিরে দেখতে হবে। আমরা দেখতে পাই যে, জীবের জীবনধারণের মৌলিক উপাদানের মধ্যে পানি অন্যতম। পানির পাশাপাশি কার্বন ও একটি শক্তির উৎস দরকার। যেহেতু পানি আমাদের অতি পরিচিত পদার্থ তাই মহাশূন্যের কোথাও পানির উপস্থিতি থাকলে সেটা আমাদের পে খুঁজে বের করা সহজ হবে। সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক ব্যাপার হচ্ছে বিজ্ঞানীরা আমাদের গ্রহের বাইরে মহাশূন্যেও পানির অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন। মঙ্গল আমাদের অতি সুপরিচিত গ্রহের মধ্যে একটি। ৭০-এর দশক থেকেই মঙ্গলে রোবটের পদচারণা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি নাসার স্প্রিট রোভার মঙ্গল থেকে যেই ছবিগুলো তুলেছে সেগুলো সত্যিই অবিশ্বাস্য। চিত্রগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, সেখানে কোনো এক সময় পানির প্রবাহ ছিল। তা ছাড়া মঙ্গলের ভূমির গভীরে আর্দ্রতা বিদ্যমান আছে। যদি আর্দ্রতাই থাকে তাহলে হয়তো জীবের অস্তিত্বও বিদ্যমান থাকতে পারে। এবার কোনো গ্রহ নয়, ঘুরে আশা যাক মহাশূন্যের এক রহস্যময় উপগ্রহ ইউরোপা থেকে, যেটা মঙ্গলের আরো ৩০ মিলিয়ন মাইল দূরে অবস্থান করছে এবং জুপিটারকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। ইউরোপা ২০০০ মাইল ব্যাসযুক্ত খুবই ছোট একটা উপগ্রহ। এটা অত্যন্ত শীতল এবং তাপমাত্রা প্রায় মাইনাস ২৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পুরো ইউরোপাটিই বরফে আচ্ছাদিত এবং বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন বরফের আস্তরণটি প্রায় ১৫ মাইল গভীর। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, এই ইউরোপার বরফ আস্তরণের তলদেশে কোথাও হয়তো গরম তাপমাত্রার প্রবাহ বিদ্যমান থাকতে পারে। যদি এমনটিই হয় তাহলে সেই তাপমাত্রা তলদেশের বরফ গলিয়ে তরল পানিতে পরিণত করার মতো মতা রাখে। এমন পরিস্থিতিতে সেখানে কোনো জলজ প্রাণী থাকতে পারে এমন ধারণা করাটাও খুব বোকামি হবে না। হয়তো তারা আমাদের পৃথিবীর সাগরের নিচে বসবাসকারী অন্য কয়েকটি প্রাণীর মতো স্বাভাবিক সাঁতার কাটে।

এতক্ষন বলছিলাম আমাদের গ্রহের বাইরে অন্য কোথাও বিদ্যমান থাকা পানিতে বসবাসকারী প্রজাতির কথা। কিন্তু পানি ছাড়াও নাইট্রোজেন হচ্ছে আরেকটি সম্ভাব্য উপাদান, যেখানে জীবের অস্তিত্ব থাকতে পারে। স্বাভাবিকভাবে নাইট্রোজেনকে আমরা গ্যাসীয় অবস্থায় দেখতে পারলেও অতি নি¤œ তাপে, প্রায় মাইনাস ৩২০ ডিগ্রি ফারেনহাইটে এটি তরল পদার্থে পরিণত হয়। এরকম নাইট্রোজেন গ্যাসে পরিপূর্ণ সৌরজগতের দু’টি গ্রহ হচ্ছে জুপিটার ও স্যাটার্ন। হতে পারে সেখানে এমন কোনো প্রজাতি আছে যারা গ্যাস দিয়ে তৈরি। জীব মানে খাবারের ওপর নির্ভরশীল। বিজ্ঞানীদের ধারণা এরকম গ্যাস দিয়ে তৈরি জীবেরা অনেক সময় খাবার হিসেবে বজ্রপাতের ফলে সৃষ্ট বিজলির আলোকেও কাজে লাগাতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো এসব এলিয়েনরাও কী আমদের মতো উন্নত মস্তিষ্কের অধিকারী? যদি সত্যিকার অর্থেই এই বিপুল গ্রহের কোনো একটিতে প্রাণীর বসবাস থাকে তাহলে কেউ না কেউ হয়তো আমাদের ব্যাপারেও জানতে আগ্রহী। অনেকের বিশ্বাস এলিয়েনরা ইতোমধ্যে আমাদের পৃথিবী আবিষ্কার করেছে অথবা খুব কাছ থেকে অবলোকন করে গেছে। এসব ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক সত্যতা পাওয়া যায়নি একটি মাত্র ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা ছাড়া।

ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৭৭ সালের ১৬ আগস্টে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওহিও অঙ্গরাজ্যে গবেষণার কাজে স্থাপিত একটি রেডিও টেলিস্কোপ মহাশূন্য থেকে ধারণ করে ইতিহাসের আলোড়ন সৃষ্টিকারী একটি সিগনাল। সিগনালটি ছিল দু’টি সংখ্যা ও চারটি বর্ণমালা নিয়ে গঠিত এক ধরনের রেডিও ওয়েভ। সঙ্কেতটিকে শব্দে রূপান্তর করলে হয় ওয়াও (WOW!)। এই ওয়াও সিগনালটি এসেছিল ২০০ আলোকবর্ষ দূরের কোনো স্থান থেকে যেটি পৃথিবীতে পৌঁছতে আনুমানিক ২০০ বছর সময় লেগেছে। আর আমরা যদি সেই সিগনালের একটি উত্তর পাঠাতে যাই সেটাও সেখানে পৌঁছতে আরো ২০০ বছর লাগবে। ৭২ সেকেন্ডের দীর্ঘস্থায়ী সেই ওয়াও সঙ্কেতটি আর কখনো শোনা যায়নি। এরকম আরো অনেক অবাক ঘটনার সাী হয়েছে আমাদের মানবসভ্যতা। তবে সেই বড় প্রশ্নের উত্তরটি এখনো অজানা। ভিনগ্রহের প্রাণী কি সত্যি আছে?

Page 1 of